
ইসলামকে বোঝা এবং চর্চা করার ক্ষেত্রে মূলধারা বা আইনি-শাস্ত্রীয় ধারার (Corporate Islam) সাথে সুফি বা রহস্যবাদী (Mystical) ধারার একটি স্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। আইনি ধারা যেখানে ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন একটি আদর্শ অতীতকে হুবহু ধরে রাখতে চায়, সেখানে সুফিবাদ ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসে অটল থেকেও পরিবর্তনশীল সময়ের সাথে মানিয়ে নেওয়ার নমনীয়তা ও সৃজনশীলতা প্রদর্শন করে।
সুফি ঐতিহ্যে একজন সাধককে বলা হয় ‘ইবনে আল-ওয়াক্ত’ বা ‘বর্তমানের সন্তান’। এর অর্থ হলো, অতীতকে আঁকড়ে ধরে থাকা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে পরম করুণাময়ের তৈরি বর্তমান মুহূর্তেই পুরোপুরি বাস করা। মিশরীয় সুফি সাধক ইবনে ‘আতা আল্লাহ (মৃত্যু ১৩০৯) বলেছিলেন, পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিকে আল্লাহর ইচ্ছার অংশ হিসেবে মেনে নিয়ে জীবনের স্রোতে নিজেকে সমর্পণ করাই প্রকৃত তাওয়াক্কুল বা বিশ্বাস। এই দৃষ্টিভঙ্গি সুফিসাধকদের আধুনিক বৈচিত্র্য, গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদকে গ্রহণ করতে শেখায়।
কুরআনের সার্বজনীন বাণী ও ঐশ্বরিক অনুকম্পাকে ভিত্তি করে সুফিবাদ বিশ্বাস করে যে, মানবজাতির বৈচিত্র্য ও ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম বা পথ স্রষ্টার প্রজ্ঞারই অংশ (কুরআন ৫:৪৮)। বিখ্যাত সুফি সাধিকা রাবেয়া আল-আদাবিয়ার ভাষায়: "আল্লাহর প্রতি আমার প্রেম শয়তানের প্রতি ঘৃণা করার সুযোগও আমাকে দেয় না।"
সুফিবাদের মূল চালিকাশক্তি হলো 'প্রেম'। এখানে সৃষ্টিজগতের প্রতিটি উপাদানকে স্রষ্টার করুণা ও সৌন্দর্যের প্রতিফলন (তাজাল্লি) হিসেবে দেখা হয়। এ কারণেই সুফিবাদ খ্রিস্টধর্ম, নিওপ্লাটোনিজম, কিংবা বেদান্ত দর্শনের মতো অন্যান্য আধ্যাত্মিক ভাবধারার সাথে ইতিবাচক সংলাপে অংশ নিতে পেরেছে।
আইনি ধারার অনেক ব্যাখ্যায় প্রাক-ইসলামী পিতৃতান্ত্রিক মনস্তত্ত্ব প্রাধান্য পেলেও, সুফি সাহিত্য ও চিন্তায় নারীদের আধ্যাত্মিক মর্যাদা বরাবরই উচ্চ। ইবনে আল-আরাবি বা জালালউদ্দিন রুমির মতো সুফিরা স্রষ্টার সৃজনশীল ও গ্রহণশীল বৈশিষ্ট্য বোঝাতে নারীসুলভ প্রতীকের ব্যবহার করেছেন।
তাছাড়া, সুফিবাদ 'জিহাদ'-কে বাহ্যিক সংঘাতের বদলে অভ্যন্তরীণ 'নফস' বা রিপু দমনের সংগ্রাম (আল-জিহাদ আল-আকবার) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। প্রবাদ রয়েছে— "যে নিজেকে চিনতে পেরেছে, সে তার রবকে চিনতে পেরেছে।"
আজকের এই কট্টরপন্থা, বৈষম্য ও বিজাতীয় বিদ্বেষের যুগে সুফিবাদের এই প্রেম, ক্ষমা ও পরমতসহিষ্ণুতার বাণী আধুনিক বিশ্বকে এক নতুন শান্তির পথ দেখাতে পারে।
(লেখক: ড. সারওয়ার আলম, অ্যাডজাক্ট প্রফেসর, জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র)