
শায়েস্তাগঞ্জ (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি:মোহাম্মদ ইনজামামুল হক (নাঈম)
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ পৌরবাসীর নিরাপদ পানির সংকট নিরসনে প্রায় ১০ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত পানি শোধনাগারটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল উদ্বোধনের পর মাত্র এক মাসের মধ্যেই পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর প্রায় ১ বছর ৫ মাস ধরে প্রকল্পটি কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় শোধনাগারের বিভিন্ন যন্ত্রপাতিতে জমেছে ধুলা-ময়লা, কোথাও ধরেছে মরিচা।
এদিকে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক ও ওষুধসামগ্রী আনা হচ্ছে জানিয়ে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রকল্পটি চালুর আশ্বাস দিয়েছেন পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান।
সরেজমিনে দেখা যায়, পৌর শহরের সুদিয়াখলা এলাকায় পুরোনো গরুর বাজারের পাশে নির্মিত পানি শোধনাগারটির প্রধান ফটকসহ বিভিন্ন স্থানে তালা ঝুলছে। প্রকল্পের চারপাশে বেড়ে উঠেছে ঘাস-আগাছা। ভেতরে পানি শোধন ও সরবরাহের যন্ত্রপাতি পড়ে আছে অব্যবহৃত অবস্থায়। পৌরবাসীর নিরাপদ পানির চাহিদা পূরণে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় এর কার্যকারিতা, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রকল্পের উদ্বোধনী ফলক অনুযায়ী, ‘বাংলাদেশের ২৩টি পৌরসভায় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন (জিডিবি-আইআরভি) প্রকল্পের আওতায়’ শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভায় ঘণ্টায় ২০০ ঘনমিটার ক্ষমতাসম্পন্ন ভূগর্ভস্থ পানি শোধনাগার নির্মাণ করা হয়। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, হবিগঞ্জ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে। এর তত্ত্বাবধানে ছিল শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভা।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, পানি শোধনাগারসহ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। নির্মাণকাজ শেষে ২০২৫ সালের ৩ মার্চ প্রকল্পটি শায়েস্তাগঞ্জ পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে একই বছরের ২৮ এপ্রিল তৎকালীন সিলেট বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন। তবে উদ্বোধনের এক মাসের মধ্যেই পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটি সচল করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পানির সংযোগ নেওয়ার জন্য জনপ্রতি ৫০০ টাকা করে পৌরসভায় জমা দিয়েও অনেকে সংযোগ পাননি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জহুর আলী বলেন, ‘পানির লাইনের জন্য ৫০০ টাকা জমা দিয়েছিলাম। পৌরসভা থেকে জমার স্লিপও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমাদের বাড়িতে পানির লাইনই দেওয়া হয়নি। পাশের বাড়িতে লাইন দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তারাও পানি পাচ্ছেন না।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, পানির সংযোগের জন্য টাকা জমা দিয়েও তাঁরা প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছেন না। তাই দ্রুত প্রকল্পটি চালুর পাশাপাশি সংযোগ কার্যক্রম সম্পন্ন এবং গ্রাহকদের ভোগান্তি নিরসনের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
রাসায়নিক ও জনবল সংকটে অচল প্রকল্প
প্রকল্পটি বন্ধ থাকার কারণ হিসেবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি সামনে এসেছে। পৌর কর্তৃপক্ষের দাবি, পানি শোধনের প্রয়োজনীয় রাসায়নিক, পর্যাপ্ত জনবল এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় প্রকল্পটি চালু রাখা সম্ভব হয়নি।
শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী কর্মকর্তা আবু সাঈদ বলেন, ‘নির্ধারিত কাজ শেষে নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পটি পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্প পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পৌর কর্তৃপক্ষের।’
শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক ও ইউএনও মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘রাসায়নিক ও মেডিসিনগুলো আনা হচ্ছে। এই প্রকল্পের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়াধীন। ইনশাআল্লাহ, ১৫ দিনের মধ্যে এটি চালু করা সম্ভব হবে।’
দ্রুত চালুর দাবি এলাকাবাসীর
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, জনগণের অর্থে নির্মিত প্রায় ১০ কোটি ৫৩ লাখ টাকার এই প্রকল্প দ্রুত চালু করে নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি উদ্বোধনের অল্প সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি কেন বন্ধ হয়ে গেল, তা খতিয়ে দেখে পরিচালনা, জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি চিহ্নিত করারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তাঁদের মতে, বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত জনসেবামূলক প্রকল্প দীর্ঘদিন অচল পড়ে থাকা দুঃখজনক। পৌর প্রশাসকের দেওয়া ১৫ দিনের মধ্যে চালুর আশ্বাস বাস্তবায়িত হলে পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের পথ তৈরি হবে।
তবে শুধু প্রকল্প চালু করাই যথেষ্ট নয়; নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করে নিরাপদ পানি সরবরাহ অব্যাহত রাখাও জরুরি।