ব্যস্ত শহরের যান্ত্রিকতা পেছনে ফেলে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের পথে পা বাড়ালেই মনে হয় সময় যেন হঠাৎ থমকে গেছে বা পেছনে হেঁটে চলেছে। যে নীরব চত্বরে একসময় ধনকুবের ব্যবসায়ীদের ঘোড়ার গাড়ির শব্দে গমগম করত, সেখানে আজ কেবল প্রাচীন ক্ষয়ে যাওয়া দেওয়াল, স্যাঁতসেঁতে ব্যালকনি আর বন্ধ জানালার সারি দেখা যায়। এটিই আমাদের ঐতিহাসিক পানাম নগরী।
সমৃদ্ধির ইতিহাস ও স্থাপত্যের নান্দনিকতা
মধ্যযুগীয় বাংলার বাণিজ্যিক কেন্দ্র সোনারগাঁওয়ের ধারাবাহিকতায় ১৯ ও ২০ শতকের দিকে পানাম নগরের উত্থান ঘটে। তৎকালীন হিন্দু কাপড় ব্যবসায়ীরা এখানে ইউরোপীয় উপনিবেশিক নকশা ও ঐতিহ্যবাহী বাঙালি স্থাপত্যের মিশ্রণে গড়ে তুলেছিলেন চোখঝাঁসানো প্রাসাদসম অট্টালিকা।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, ১৬১১ সালে মোগলরা সোনারগাঁওয়ের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর পানামকে মূল শহরের সাথে যুক্ত করতে তৈরি করা হয় বেশ কয়েকটি সেতু ও রাস্তা। পানাম ব্রিজ, দালালপুর ব্রিজ ও পানামনগর ব্রিজ আজও সেই মোগল স্থাপত্যের স্বাক্ষী বহন করছে। এই নগরের আবাসিক ভবনগুলো সাধারণত তিনটি ধাঁচে তৈরি—কেন্দ্রীয় বিশাল হল ঘরকেন্দ্রিক, খোলা উঠান কেন্দ্রিক এবং একতলা বিশিষ্ট সংকর নকশা।
পরিত্যক্ত হওয়ার গল্প ও বর্তমান বাস্তবতা
১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগ এবং ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় এখানকার তৎকালীন বাসিন্দারা ধীরে ধীরে এই শহর ছেড়ে চলে যান। ফলে একসময়ের কোলাহলপূর্ণ নগরীটি সম্পূর্ণ নির্জন ও পরিত্যক্ত রূপ নেয়। দেওয়ালের ফাটলে গজিয়ে ওঠা বটবৃক্ষ আর বৃষ্টির ছাপে প্রকৃতি এখন নগরটিকে নিজের মতো করে গ্রাস করে নিচ্ছে।
পর্যটকদের অনুভূতি ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পরিকল্পনা
পানাম নগরে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা জানান, ছবি তোলার পাশাপাশি এটি ইতিহাসকে খুব কাছ থেকে অনুভব করার এক চমৎকার স্থান। তবে নিয়মিত পরিচর্যা, তথ্যবোর্ড, আধুনিক অডিও গাইড ও অভিজ্ঞ গাইড থাকলে স্থানটি সম্পর্কে দর্শনার্থীরা আরো ভালোভাবে জানতে পারতেন।
ঢাকা আঞ্চলিক প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা জানান, পানাম নগরীকে পর্যটকদের জন্য আরও আকর্ষণীয় ও সুবিধাজনক করে তুলতে তারা একটি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।
দৈনিক দুর্বার